রোজা: কিছু জরুরি তথ্য

রমজানের রোজা ইসলামের একটি স্তম্ভ। আল্লাহর তাআলার পক্ষ থেকে ফরজ করে-দেয়া একটি বিধান। তাই রমজানের রোজাকে অস্বীকার করার কোনো সুযোগ নেই। যে ব্যক্তি অস্বীকার করবে, ইনকার করবে, সে কাফের বলে গণ্য হবে। কেননা অস্বীকার করার অর্থ হবে- আল্লাহ, তাঁর রাসূল ও ইজমায়ে উম্মতকে মিথ্যা সাব্যস্ত করা। আল কুরআনের স্পষ্ট বক্তব্যে রমজানের রোজা ফরজ হওয়ার বিষয়টি প্রমাণিত। ইরশাদ হয়েছে:
(হে মুমিনগণ, তোমাদের উপর সিয়াম ফরজ করা হয়েছে, যেভাবে ফরজ করা হয়েছিল তোমাদের পূর্ববর্তীদের উপর। যাতে তোমরা তাকওয়া অবলম্বন কর। ) [সূরা: আল বাকারা:১৮৩]
অন্যত্র ইরশাদ হয়েছে:
(রমজান মাস, যাতে কুরআন নাযিল করা হয়েছে মানুষের জন্য হিদায়াতস্বরূপ এবং হিদায়াতের সুস্পষ্ট নিদর্শনাবলি ও সত্য-মিথ্যার পার্থক্যকারীরূপে। সুতরাং তোমাদের মধ্যে যে মাসটিতে উপস্থিত হবে, সে যেন তাতে সিয়াম পালন করে।) [সূরা আল বাকারা:১৮৫]
সে হিসেবে প্রত্যেক প্রাপ্তবয়স্ক, সুস্থ মস্তিষ্কসম্পন্ন, মুকীম, সামর্থ্যবান মুসলিমের উপর রোজা রাখা ফরজ। নারী-পুরুষ নির্বিশেষে রোজা রাখা ফরজ। সে হিসেবে অমুসলিমের উপর রোজা রাখা ফরজ নয়। তবে যদি কেউ রমজান মাসে ইসলাম গ্রহণ করে,তাহলে, যেদিন থেকে ইসলাম গ্রহণ করেছে সেদিন থেকে রোজা রাখা ফরজ হবে।
অপ্রাপ্ত বয়স্ক শিশুর জন্যও রোজা রাখা ফরজ নয়। তবে যদি রোজা রাখতে কষ্ট না হয় তাহলে রোজা রাখার অভ্যাস গড়ে-তোলার জন্য রোজা রাখার নির্দেশ দেয়া হবে। সাহাবায়ে কেরাম রাযি. তাঁদের বাচ্চাদেরকে রোজা রাখাতেন। এমনকী বাচ্চাদের কেউ ক্ষুধায় কাঁদতে শুরু করলে কোনো খেলনা দিয়ে সূর্যাস্ত পর্যন্ত ভুলিয়ে রাখতেন।
ছেলেদের বেলায় তিনটি আলামত পরিলক্ষিত হলে প্রাপ্তবয়স্ক বলে ধরে নেয়া হবে।
১.স্বপ্নদোষ বা অন্যকোনো কারণে বীর্যপাত হলে।
২.অথবা যৌনাঙ্গের উর্ধ্বভাগে কেশ দেখা দিলে।
৩.অথবা বয়স পনেরো বছর হলে।
অবশ্য মেয়েদের জন্য চতুর্থ একটি আলামত রয়েছে। আর তা হল মাসিক দেখা দেয়া। যদি দশ বছর বয়সের কিশোরীরও মাসিক দেখা দেয়, তাহলে তাকে পূর্ণ বয়স্ক বলে ধরা হবে।
ছেলে বা মেয়ে প্রাপ্তবয়স্ক হলে শরীয়তের সকল আদেশ-নিষেধ পালন করা আবশ্যক হয়ে পড়বে। আর এ সময় ছেলেমেয়েকে যথার্থরূপে শরীয়তের আদেশ-নিষেধ মানতে বাধ্য করার মধ্যেই নিহিত ছেলেমেয়ের প্রতি প্রকৃত আদর প্রদর্শন, ছেলেমেয়ের প্রতি মায়া-মমতার প্রকাশ।
যারা অপ্রাপ্তবয়স্ক, অথবা পাগল, অথবা অপারগ অশীতিপর বৃদ্ধ এদের উপর রোজা রাখা ফরজ নয়। যারা স্থায়ীভাবে অপারগ যেমন বৃদ্ধ ও অসুস্থ ব্যক্তিরা, যাদের ভালো হওয়ার সম্ভাবনা নেই, তারাও রোজা রাখবে না। তবে প্রতিদিনের রোজার পরিবর্তে একজন মিসকিনকে খাবার খাওয়াবে। যদি অসুস্থ ব্যক্তির সুস্থ হওয়ার সম্ভাবনা থাকে এবং রোজা রাখা তার পক্ষে কষ্টকর না হয়, অথবা ক্ষতিকর না হয়, তাহলে তাকে অবশ্যই রোজা রাখতে হবে। কেননা এ অবস্থায় সে অপারগ নয়, তার কোনো উযর নেই যার কারণে রোজা ভাঙ্গা বৈধ হবে। আর যদি এমন হয় যে রোজা রাখা তার পক্ষে কঠিন, তবে ক্ষতিকর নয়, তবে সে রোজা ভঙ্গ করবে। কেননা এ অবস্থায় রোজা রাখা তার জন্য মাকরুহ হবে। আর যদি রোজা রাখা তার জন্য ক্ষতিকর হয় তবে সে অবশ্যই রোজা ভঙ্গ করবে; কেননা এ অবস্থায় রোজা রাখা হারাম বলে বিবেচিত হবে। তবে যখন সুস্থ হবে বিগত রোজাগুলো কাজা করে নিবে। যদি সুস্থ হওয়ার আগেই মারা যায় তবে সে দায়মুক্ত থাকবে।
গর্ভবতী নারীর পক্ষে রোজা রাখা কষ্টকর হলে রোজা ভাঙ্গা বৈধ হবে। পরবর্তীতে, গর্ভাবস্থায় অথবা সন্তান প্রসবের পর, যখন সহজ বলে মনে হবে রোজাগুলো কাজা হিসেবে আদায় করে নিবে। দুগ্ধদানকারী মহিলারও যদি দুগ্ধদান করার কারণে কষ্ট হয়,অথবা রোজা রাখার ফলে দুধ কমে গিয়ে সন্তানের খাদ্য ঘাটতি ঘটে, এমতাবস্থায় রোজা ভঙ্গের অনুমতি রয়েছে। তবে পরবর্তীতে তাকে এ রোজাগুলো রেখে নিতে হবে।
মুসাফির ব্যক্তির জন্য যদি রোজা রাখা সহজ হয় তাহলে সে রোজা রাখবে। আর যদি রোজা না রাখা সহজ হয় তাহলে রোজা ভঙ্গ করবে। পক্ষান্তরে যদি এমন হয় যে রোজা রাখা না রাখা উভয়টাই তার জন্য সমান, তাহলে রোজা রাখাটাই উত্তম বলে গণ্য হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামের আমল দ্বারা এমনটাই প্রমাণিত। উপরন্তু রোজা রেখে ফেললে রোজা রাখার দায়িত্ব থেকেও সে মুক্ত হয়ে যাচ্ছে। আর মাহে রমজানে রোজা রাখা রমজানের বাইরে রোজার রাখার চেয়ে, সাধারণত, অনেক হজ। যদি সফরের কারণে রোজা রাখা কষ্টকর হয়,তাহলে রোজা রাখা মাকরুহ বলে বিবেচিত হবে। কষ্ট যদি অতিরিক্ত আকারে হয়, তাহলে রোজা রাখা হারাম বলে বিবেচিত হবে। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মক্কা বিজয়ের বছর রমজান মাসে মক্কা অভিমুখে রওনা হন। এ সময় তিনি রোজা অবস্থায় ছিলেন। নবী সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লামকে বলা হল যে রোজা রেখে মানুষের খুব কষ্ট হচ্ছে। আপনি কি করেন তার দিকে মানুষ চেয়ে আছে। অতঃপর আসরের পর রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম এক পেয়ালা পানি তলব করলেন। তিনি তা ঊর্ধ্বে ওঠালেন যাতে মানুষ দেখতে পারে। অতঃপর তিনি তা পান করলেন এ অবস্থায় যে লোকেরা তার দিকে তাকিয়ে আছে। এরপর তাঁকে বলা হলো যে কিছু লোক রোজা রেখেই চলেছে। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম বললেন: ওরা অবাধ্য, ওরা অবাধ্য। [ ]
যে ব্যক্তি রোজা রাখা অবস্থায় দিনের বেলায় সফর করে তার জন্য উচিত হবে ওই দিনের রোজা পূর্ণ করা। আর যদি পূর্ণ করা কষ্টকর হয় তবে রোজা ভঙ্গ করবে এবং পরবর্তীতে কাজা করবে।
হায়েয ও নেফাসগ্রস্তা নারীরা রোজা রাখবে না, তবে যদি সেহরির সময় শেষ হওয়ার সামান্য আগেই পবিত্র হয়ে যায়, তবে সেদিন অবশ্যই রোজা রাখবে। পবিত্র হওয়ার জন্য গোসল করতে না পারলেও কোনো সমস্যা হবে না। এমতাবস্থায় সুবহে সাদেক উদয় হওয়ার পর গোসল করে নিবে। তবে হায়েয ও নিফাসগ্রস্তা নারীদের যে সব রোজা ভাঙ্গা পড়েছে তা কাজা করে নিতে হবে।
মাহে রমজানে তারাবির নামাজ একটি গুরুত্বপূর্ণ ইবাদাত। রাসূলুল্লাহ সাল্লাল্লাহু আলাইহি ওয়াসাল্লাম মাহে রমজানে কিয়ামুল লাইল অর্থাৎ ইবাদাতের মাধ্যমে রাত্রিযাপনের প্রতি গুরুত্ব দিয়ে বলেছেন:
(من قام رمضان إيمانا واحتسابا غفر له ما تقدم من ذنبه)
(যে ব্যক্তি ঈমান জাগ্রত রেখে, আল্লাহর কাছে ছাওয়াবের আশায় রমজানে কিয়ামুল লাইল করবে তার অতীতের সকল গুনাহ মাফ করে দেয়া হবে)
আর তারাবির নামাজ হলো কিয়ামুল লাইলেরই একটি অংশ। তাই আসুন আমরা এই নামাজকে যথার্থরূপে আদায় করি। সুন্দরভাবে আদায় করি। ইমাম যতক্ষণ থাকেন ততক্ষণ আমরাও তার পেছনে থাকি। কেননা যে ব্যক্তি ইমাম প্রস্থান করার আগ পর্যন্ত তার সাথে কিয়ামুল লাইল করল,তার আমল নামায় পূর্ণ রাত্রিযাপনের ছাওয়াব লিখা হল, যদি সে বিছানায় গিয়ে ঘুমিয়ে থাকে তবু।
যারা ইমাম তাদেরকে এব্যাপারে যথেষ্ট সচেতন হতে হবে। যারা তার পেছনে দাঁড়িয়ে থাকে তাদের ব্যাপারে ইমামদের গুরুত্ব দিতে হবে। অতঃপর তারাবির নামাজ যেন সুন্দরভাবে আদায় হয় সেদিকে তাদেরকে সজাগ দৃষ্টি রাখতে হবে। তারাবির নামাজে ধীরস্থিরতা, ইতমিনান বজায় রাখতে হবে। দ্রুত তারাবিহ শেষ করে অব্যাহতি নেয়ার প্রবণতা থেকে ইমাম সাহেবদেরকে মুক্ত হতে হবে। কেননা এরূপ করলে নিজেকে ও যারা তার পেছনে রয়েছে সবাইকে কল্যাণ থেকে বঞ্চিত করা হবে।
সাথে সাথে ইমাম সাহেবদের মনমনসিকতা যেন এরূপ না হয় যে অতি দ্রুত নামাজ পড়ে মানুষ বের হওয়ার আগেই বের হয়ে চলে যাবে। অথবা ঘনঘন সিজদা দিয়ে অসুন্দরভাবে নামাজ পড়ে দায়মুক্ত হওয়ার চেষ্টা করবে। কেননা আল্লাহ তাআলা বান্দার সুন্দর আমল দেখতে চান, দ্রুত আমল অথবা অধিক আমল দেখার কথা কোথাও লেখা নেই। আল্লাহ আমাদের সবাইকে যথার্থরূপে সিয়াম সাধনার তাওফীক দান করুন। আমীন।